
উখিয়া নিউজ ডেস্ক:;
কক্সবাজারে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে রেলাইন,কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ। সব কিছু ঠিক থাকলে সরকারের এই মেয়াদেই দেশের মানুষ এসব প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার ভিত্তি রচনার ক্ষেত্রে কক্সবাজারের এই মেগা প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা জানিয়েছেন, যে গতিতে এ সব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে তাতে আশা করা যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পগুলো শেষ হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পাদিত গত ১০ বছরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে,কক্সবাজার জেলার এই মেগা প্রকল্প হচ্ছে- দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প,খুরুস্কুল আশ্রায়ন প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প।
সূত্র জানিয়েছে, দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন প্রকল্পটি হলে কক্সবাজারের সঙ্গে রেলযোগাযোগ বাড়বে। ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে এই প্রকল্প। এডিবির আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। যা মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার মুখে স্থবির হয়ে থাকলেও বর্তমানে চলছে চট্টগ্রামের দোহাজারী হয়ে কক্সবাজার এবং ঘুমধুম রেলপথ স্থাপনের কাজ। ইতোধ্যেই প্রয়োজনীয় ১ হাজার ৩শ ৬৭ একর জায়গার মধ্যে ২৪৭ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ট্রান্স এশিয়ান রেলের অর্ন্তভুক্ত এই সংযোগটি বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার চলে যাবে। নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে এই রেললাইন চালু হওয়ার কথা।
দোহাজারী-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মফিজুর রহমান বলেন, ‘এ রেললাইনের রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণের কাজসহ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ অগ্রাধিকারভিত্তিতে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি অধিগ্রহণও শেষ হয়েছে। রেললাইনের রাস্তা নির্মাণসহ অনেক কাজ দৃশ্যমান হচ্ছে।
তাছাড়া কক্সবাজার সদরেই ঝিনুক আকৃতির রেলওয়ে স্টেশন হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩৬৫ একরের মধ্যে চট্টগ্রামে ৩৭ একর জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিয়েছি। আর কক্সবাজারে ১ হাজার ২ একরের মধ্যে মাত্র ২শ’ ১০ একর জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘আশা করছি খুব দ্রুত কাজ বুঝিয়ে দিতে পারবো। ১০০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপনের জন্য ১৮ হাজার ৫শ ২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৬ হাজার কোটি টাকা আর বাকিটা জোগান দেবে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রকল্প হতে আসবে বিপুল পরিমাণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। জাইকার আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হবে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে। প্রকল্প এলাকায় সড়ক নির্মাণ, টাউনশিপ গড়ে তোলাসহ আনুষঙ্গিক কাজের প্রায় ১৮ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। মাতারবাড়ি ইউনিয়নে ১ হাজার ৪১৪ একর জমির ওপর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপান সরকারের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা হিসেবে পাওয়া গেছে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি তিন লাখ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে সাত হাজার ৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার জোগান দেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার আশা করছে সরকার। সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে বাস্তবায়নাধীন যে ১০টি প্রকল্প রয়েছে তার মধ্যে খরচের দিক দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরই রয়েছে মাতারবাড়ির প্রকল্পটি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের আগস্টে মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই পরের বছর জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান হামলায় জাপানি প্রকৌশলীসহ ১৭ বিদেশি নিহত হওয়ায় সেই দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে গত বছর ২৭ জুলাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানি কনসোর্টিয়াম সুমিতোমো করপোরেশন, তোশিবা করপোরেশন ও আইএইচআই করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড-সিপিজিসিবিএল।
সূত্র আরও জানায়, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ চলছে। গ্যাসের প্রাকৃতিক উৎস ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
সর্বশেষ মহেশখালীর সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি জি টু জির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগী দেশ বা দাতা সংস্থা সন্ধানের প্রচেষ্টা চলছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা হয়নি। এরপর এক প্রকার ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে প্রকল্পটি। যদিও প্রকল্পটি বাতিলও করেনি সরকার। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পটি এখনও ফাস্ট ট্র্যাকেই রাখা হয়েছে বলে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
২০০৯ সালে মহাজোট সরকার গঠনের পর প্রথম সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। জাপানের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সে সময় এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও পরিচালনা করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক কনসালটেশন ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষা অনুযায়ী সোনাদিয়ার পুরো প্রকল্পটি শেষ হতে ৩০ বছর সময় প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির এ সমীক্ষা পুরনো হয়ে যাওয়ায় আবারো সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রয়োজন মনে করছে সরকার।
জানতে চাইলে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ বলেন, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে একটি সমীক্ষা চলছে। সোনাদিয়ায়ও বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) পর্যটন সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্প করবে। তাদের ওই প্রকল্প সমীক্ষা করে দেখতে হবে। তারপর সোনাদিয়ার বিষয়। তবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
প্রবৃদ্ধির সঞ্চালক ১০টি বৃহৎ প্রকল্পকে মেগা প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজরদারিতে আনা হয় বেশ কয়েক বছর আগে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পরিবীক্ষণের জন্য ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হয়। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পটি এখনো এ ১০ প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে বলে গত বছরের ৭ জুন অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন।
গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ২০১০ সালের আগস্টে ‘গভীর সমুদ্রবন্দর সেল’ নামে একটি সেলের উদ্বোধন করা হয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন এ সেলের তথ্যমতে, প্যাসিফিক কনসালটেশন ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষা অনুযায়ী তিন পর্যায়ে এ বন্দর নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। ২০৩৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয় পর্যায়ের ও ২০৫৫ সাল নাগাদ চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্মাণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়। তবে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই না হওয়ায় প্রকল্পটি নিয়ে দৃশ্যমান আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার বাচাঁও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক এড.আয়াছুর রহমান বলেন,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে ১ লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করছেন। আশা করছি দ্রুত এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করে জেলাবাসী উন্নয়নের ফল ভোগ করবে।

পাঠকের মতামত